বিশ্বের দেশে দেশে সরকারের ব্যয় বাড়ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে বাজেট ঘাটতিও। এ ঘাটতি পূরণে এসব সরকারের ঋণনির্ভরতাও বাড়ছে। শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে অন্য অনেক দেশেই এ ঋণ এখন বড় আকার ধারণ করেছে। এর সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারগুলোর ব্যয়ের বোঝা আরো বড় হচ্ছে। বিপুলায়তনের ঋণের এ দুষ্টচক্রের ভার লাঘবে সুদহার কমিয়ে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে কোনো কোনো দেশের সরকার। আবার কিছু ক্ষেত্রে বাজার পরিস্থিতির কারণেও ব্যাহত হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীন নীতি প্রয়োগের সক্ষমতা।
বৈশ্বিক পুঁজি, পণ্য ও মুদ্রাবাজারের বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা, সামনের বছরগুলোয়ও আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নীতি প্রয়োগের স্বাধীনতা ব্যাহত হতে পারে বারবার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মুদ্রানীতির (মনিটরি পলিসি) নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠতে পারে সরকারের আর্থিক নীতি (ফিসকল পলিসি)। এ কারণে আসন্ন বছরগুলোকে ‘ফিসকল ডমিন্যান্স’-এর যুগ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন বাজারের বিনিয়োগকারী ও বিশ্লেষকরা।
সরকারি চাপের সবচেয়ে বড় উদাহরণ বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র। ঋণ পরিশোধ বাবদ বিলিয়ন ডলার বাঁচাতে ফেডারেল রিজার্ভকে (ফেড) সুদহার কমাতে নিয়মিত হুমকির মধ্যে রেখেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে সরকারের প্রকাশ্য চাপ না থাকলেও সরকারি ঋণের বোঝা এবং এ বাবদ খরচ বৃদ্ধি যুক্তরাজ্য ও জাপানের মতো দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আর্থিক নীতি শিথিল করতে বাধ্য করছে।
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগফ বলেছেন, ‘সরকারি ঋণ ও এ বাবদ খরচ সরকারগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ করার রাজনৈতিক প্ররোচনা দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা একটি নতুন ফিসকল ডমিন্যান্সের যুগে প্রবেশ করেছি।’
যুক্তরাষ্ট্রে স্বল্পমেয়াদি বন্ডের সুদহার মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারিত। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি সুদহার নির্ধারণ হয় বাজারের গতিপ্রকৃতির ভিত্তিতে। বর্তমানে স্বল্পমেয়াদি ঋণে সুদহার কম, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদের ক্ষেত্রে বেশি। একে বৈষম্য উল্লেখ করে বিশ্লেষকরা বলছেন, বিনিয়োগকারীরা ভাবছেন যে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেয়ে নীতি শিথিল রাখার দিকে বেশি মনোযোগী ফেড। বর্তমানে দেশটিতে দুই ও ৩০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহারের ব্যবধান ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠে এসেছে।
যুক্তরাজ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গিল্টে (বন্ড) ইল্ড এখন ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চের কাছাকাছি। এর তুলনায় ৩০ বছর মেয়াদি মার্কিন বন্ডের ইল্ড প্রায় ৪ দশমিক ৯ শতাংশ।
গত সপ্তাহে মূল্যস্ফীতি-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের পর আরেক দফা ফেড চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলকে আক্রমণ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের বিশ্লেষকরা বলছেন, ওই সময় দুই বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড দশমিক শূন্য ২ শতাংশীয় পয়েন্ট হ্রাস পায়। কারণ বিনিয়োগকারীরা সুদহার কাটছাঁট হবে এমনটা প্রত্যাশা করছিলেন। কিন্তু ৩০ বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড দশমিক শূন্য ৪ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে যায়।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছেন, গত মাসে প্রকাশিত মূল্যস্ফীতির তথ্য তুলনামূলকভাবে সাধারণই ছিল। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়া ছিল অস্বাভাবিক, যা পাওয়েলকে সরিয়ে দেয়া বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি নিয়ন্ত্রণে হোয়াইট হাউজ আরো পদক্ষেপ নিতে পারে এমন ইঙ্গিত দেয়।
সম্প্রতি হোয়াইট হাউজের সঙ্গে প্রশাসনিকভাবে যুক্ত স্টিফেন মিরানকে ফেডের বোর্ডে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সুদহার কমানোর পক্ষে চাপ দেবেন তিনি। এ বিষয়ে রয়্যাল লন্ডন অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের মাল্টি-অ্যাসেট ইনভেস্টিং বিভাগের প্রধান ট্রেভর গ্রিথাম বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে ফিসকল ডমিন্যান্সের ঝুঁকি বাড়ছে।’
সরকারি ব্যয় ও ঋণ চাপের এ প্রবণতার সঙ্গে অন্যান্য অনেক দেশেও মিল রয়েছে। তবে সেখানে অবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের মতো এত বিশৃঙ্খল নয়।
উন্নত দেশগুলোর সংস্থা ওইসিডির পূর্বাভাস অনুসারে, চলতি বছর উচ্চ আয়ের দেশগুলোর সরকারি ঋণ ১৭ ট্রিলিয়ন বা ১৭ লাখ কোটি ডলারে পৌঁছবে, যা ২০২৪ সালে ১৬ ট্রিলিয়ন ও ২০২৩ সালে ছিল ১৪ ট্রিলিয়ন।
এমন অবস্থায় উন্নত দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন তাদের নীতি ও ব্যালান্সশিটকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনছে। অনেক বছর ধরে কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং বা বিপুল পরিমাণে সরকারি বন্ড কেনার পর সেই বন্ডগুলো ধীরে ধীরে কমাতে বা বিক্রি করতে চাইছে। কিন্তু বন্ড বিক্রি করে ব্যালান্সশিট সংকুচিত করার প্রচেষ্টা ইল্ড বাড়াতে পারে এবং সরকারের ঋণ-পরিশোধের খরচও বাড়াতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
কিছু অর্থনীতিবিদ উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, এ ধারা সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নেয়া থেকে স্বল্পমেয়াদি ঋণে স্থানান্তর করবে। এতে সুদহার ওঠানামাজনিত অস্থিরতার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন কেউ কেউ। জুপিটার অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ফিক্সড ইনকাম প্রধান ম্যাথিউ মরগানের মতে, বাজারে সুদহারের উচ্চ ওঠানামায় দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বা বন্ড রাখা কঠিন। কারণ বিনিয়োগকারীরা আরো বেশি অনিশ্চয়তায় থাকেন। ফলে সরকারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ইস্যু আরো কঠিন হয়ে যায়। এতে জিডিপি অনুপাতে বেশি ঋণ নিয়েছে এমন দেশগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ম্যাক্রো খাতের প্রখ্যাত বিনিয়োগকারী রে ডেলিও। তিনি বলেন, ‘যদি বন্ডের ইল্ড খুব বেশি হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে আবার হস্তক্ষেপ করতে হবে। তাদের টাকা ছাপাতে হবে এবং বন্ড কিনতে হবে যাতে সুদহার কম রাখা যায়, যা মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটাবে।’